উদয় রহমানWRITER / MUSICIAN মূল পাতায় ফিরুন

একান্ত গল্প · শুধু পাঠকদের জন্য

বৌভাত

আমার ছেলের বিয়ের রাতে আমি সেই লোকটার সাথে হাত মিলিয়েছি, যাকে আমি ত্রিশ বছর ধরে খুন করতে চেয়েছি।

কমিউনিটি সেন্টার, ধানমন্ডি। সাতশো মেহমান। স্টেজে আমার ছেলে নিলয় আর ওর বউ তানহা। আর আমার পাশে, একই সোফায়, তানহার বাবা। মকবুল হোসেন।

যে লোকটা উনিশশো আটানব্বই সালে আমার ফ্যাক্টরি বেদখল করেছিল।

ছেলে যখন প্রথম মেয়েটার নাম বলেছিল, আমি নামটা শুনিনি। আমি শুনেছিলাম বাবার নামটা। নিলয় বলেছিল, আব্বা, মেয়ের বাবা মকবুল হোসেন, গার্মেন্টসের ব্যবসা।

আমি বলেছিলাম, এ বিয়ে হবে না।

কেন না, সেটা আমি বলিনি। এত বছর আমি কাউকে বলিনি। আমার স্ত্রী শুধু জানত।

ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন?

আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, এই মেয়েকে বিয়ে করলে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না!

তারপর ও একটা কথা বলেছিল। আব্বা, তুমি যেই কারণটা বলতে পারতেছো না, ওইটা কি আমার ভালর জন্য, না তোমার?

ছয় মাস পরে আমি হ্যাঁ বলেছি। কেন, সেটা আমি নিজেও পুরো জানি না। হয়তো ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে।

আজ আমি সোফায় বসে আছি। আর মকবুল হোসেন আমার পাশে বসে আছে। আর দুইজনের কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছি না। ইচ্ছে হচ্ছে এখনি গলাটা চিপে ধরি।

প্রথম ধাক্কাটা এল সাড়ে আটটায়।

মকবুলের ছোট ভাই, মাতাল, স্টেজের সামনে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ভাই, আপনে তো বিরাট মনের মানুষ। পুরান কথা ভুইলা গেছেন। মকবুল ভাই তো এখনো রাইতে ঘুমাইতে পারে না।

আমি বললাম, ‘কী বলতে চাচ্ছেন?’

ও থমকে গেল। আমার মুখ দেখল। তারপর হাসার চেষ্টা করল। বলল, ‘না, কিছু না। বিয়ের রাইত।’

ও চলে গেল। আর আমি বসে রইলাম, আর আমার মাথায় একটা কথা ঘুরতে লাগল। মকবুল এখনো রাতে ঘুমাতে পারে না। ভাবলাম, চুরি করে আবার ঘুমাতে পারবে না কেন? মকবুল তো জিতেছিল। আমার ভয়ে নাকি?

উনিশশো পঁচানব্বই সালে আমি আর মকবুল একসাথে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। নারায়ণগঞ্জে একটা ছোট ফ্যাক্টরি, সুতা। দুইজনের ইনভেস্ট, দুইজনের নাম। তিন বছর মোটামুটি লোকাল মার্কেটে ভাল চলল। তারপর একটা বিদেশি অর্ডার এল, বড়। ঠিকভাবে ফুলফিল করতে পারলে বেশ বড় অংকের প্রফিট। আর অর্ডারটার সাথে একটা কাগজ, যেটায় ফ্যাক্টরির মালিকানা লাগবে, একজনের নামে।

মকবুল বলেছিল, তোর নামে হোক। আমি বলেছিলাম, না, তোর নামে। শেষে কাগজে ওর নাম গেল, কারণ ব্যাংকে ওর হিসাব বেশি পরিষ্কার ছিল।

আর তার ছয় মাস পরে আমি ফ্যাক্টরির গেটে গিয়ে দেখি তালা। আর তালার উপরে একটা নোটিশ, নতুন মালিকের নামে। মকবুল হোসেন।

আমি ওর বাসায় গিয়েছিলাম। ও দরজা খোলেনি। ওর ছোট ভাই দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, ভাই এখন কথা বলতে পারবে না। ব্যস্ত অনেক।

আমি আর কোনোদিন যাইনি। আমি অন্য ব্যবসা করেছি, চায়না থেকে মেশিন আনিয়ে মাছের খাবার বানানোর ব্যবসা, অনেক বড় করেছি ফ্যাক্টরি আজ। ছেলেকে বিদেশে পড়িয়েছি। কিন্তু এই ত্রিশ বছর, বহুবার ওই তালাটা দেখেছি। চোখ বন্ধ করলেই। আর ঘুমাতে পারিনি।

দ্বিতীয় ধাক্কা এল সাড়ে নয়টায়।

স্টেজের পিছনে মেয়েদের সাজগোজের ঘর। আমি ভুল করে ঢুকে পড়েছিলাম, ওয়াশরুম খুঁজতে। ভিতরে দুইজন মহিলা বসে আছে, পাশাপাশি, হাত ধরে। আমার স্ত্রী। আর তানহার মা।

ওরা কাঁদছিল। আর হাসছিল। একসাথে।

আমার স্ত্রী আমাকে দেখে চোখ মুছল। তানহার মা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ভাই, আপনি আমারে চিনেন না। কিন্তু আমি আপনারে চিনি।

আমি বললাম, কীভাবে?

উনি বললেন, আপনার স্ত্রী আর আমি একই কলেজে পড়ছি। ও আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিল। পঁচানব্বইয়ের পরে আমরা দুইজন দুই দিকে চইলা গেছিলাম, কারণ স্বামীরা যুদ্ধ করতেছিল। ত্রিশ বছর আমরা কথা বলি নাই।

আমি আমার স্ত্রীর দিকে তাকালাম। ও বলল, ‘তোমরা দুইজন কথা বলো নাই। শাস্তিটা কিন্তু শুধু তোমরা পাও নাই।’

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ওয়াশরুম আর খোঁজা হলো না।

তৃতীয় ধাক্কা এল রাত দশটায়। এবং এইটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।

তানহা, আমার ছেলের নতুন বউ, লাল বেনারসিতে, স্টেজ থেকে নেমে সোজা আমার কাছে এল। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তারপর হাতের মুঠো থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে আমার হাতে দিল।

বলল, চাচা, এইটা আপনার।

আমি খুললাম।

কাগজটা পুরানো, হলুদ, ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে গেছে। উনিশশো আটানব্বই সালের একটা দলিল। ফ্যাক্টরির। মালিকানার দলিল।

শুধু মকবুলের নামে করা যে দলিল সেটা না।

মকবুল আর আমার দুজনের নামেই ব্যবসার পার্টনারশিপ ডকুমেন্ট।

আর নিচে একটা সই, মকবুলের। তারিখ, উনিশশো আটানব্বইয়ের অক্টোবর। ফ্যাক্টরিতে তালা পড়ার কিছুদিন আগে বানানো।

আমি কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, আর আমার চারপাশের সাতশো মানুষের শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছিল।

তানহা বলল, ফ্যাক্টরিতে তালা পড়ার পরে বাবা সাত মাস জেলে ছিল। এই কাগজটা তার পুরনো ফাইলে পেয়েছি। বাকিটা আপনি বাবাকে জিজ্ঞেস করেন।

আমি তানহার কথা বুঝলাম না। মকবুলের দিকে তাকালাম।

লোকটা সোফায় বসে আছে, মেহমানদের দিকে তাকিয়ে, ষাট পার হওয়া একটা শরীর, কাঁধ ঝুলে গেছে। ত্রিশ বছর ধরে আমি এই লোকটাকে দেখেছি একটা তালা হিসাবে, পরম শত্রু বেঈমান হিসেবে। আজ প্রথম দেখলাম একটা মানুষ হিসাবে, আর দেখে বুঝলাম, লোকটা আমার মতো দেখতে। একই কাঁধ, একই ঝোলা। একই ত্রিশ বছর।

আমি উঠে গিয়ে ওর পাশে বসলাম।

আমি বললাম, তুই তো জানতি আমি তোরে চোর ভাবি!

ও বলল, জানতাম। বিদেশি অর্ডারটা ভুয়া ছিল, একটা স্ক্যাম, দেরি হয়ে যায় টের পাইতে, যার নামে ফ্যাক্টরি, তার জেল হবে। এরপর জেলে রইলাম সাত মাস।

ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘তুই যেদিন আমার দরজায় আসছিলি, আমি ভিতরে ছিলাম। দরজার পিছনেই। তোর গলা শুনছি। আমি খুলি নাই, কারণ খুললে বলতে হইত, আর বললে তুই আমার ভুলের লাইগা নিজেরে বিপদে ফালায়া দিতি। ভাবি তখন অন্তঃসত্ত্বা, বাচ্চাটা চলে আসবে কয়দিন পরেই দুনিয়ায়। আমি চাইছিলাম তুই এই বিপদ থেকে দূরে সরে যা।’

আমি বললাম, জেল থেকে বের হয়েও তো আসতে পারতি আমার কাছে!

মকবুল বলল, প্রথমে তোরে বাঁচানোর জন্য চুপ ছিলাম। পরে লজ্জায় চুপ ছিলাম। তারপর অহংকারে। শেষে এত দেরি হইছে যে কীভাবে শুরু করব বুঝি নাই।

আমি বললাম, আর এইবার?

ও আমার দিকে ঘুরল। বলল, তানহাকে বলছিলাম একদিন এই কথাগুলো। এরপর তানহাই পুরনো ফাইল ঘেঁটে কাগজটা বের করল তোকে দেখানোর জন্য।

চতুর্থ ধাক্কা। শেষটা। রাত এগারোটা।

আমার ছেলে নিলয় স্টেজ থেকে নেমে এল। আমাকে আর মকবুলকে একসাথে বসা দেখে ও থামল না, অবাক হলো না। ও আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, যেভাবে আমি ওর সামনে ছোটবেলায় বসতাম স্কুলের জুতার ফিতা বাঁধার সময়।

ও বলল, আব্বা, আমি জানি তুমি কী ভাবতেছো। ভাবতেছো, কেমনে হইল, এত কাকতাল।

আমি বললাম, তুই জানতি?

ও বলল, দুই বছর ধরে।

ও বলল, তানহার সাথে হঠাৎ পরিচয় হয় নাই। তানহা আমাকে খুঁজে বের করছে। প্রথম দিন কফি খেতে বসে ও আমাকে কাগজটা দেখাইছে।

বলল, আমার বাবা আর তোমার বাবা একটা লুপে আটকায়া আছে। ত্রিশ বছর একই রাত, একই তালা, দুই দিক থেকে। ওরা নিজেরা বের হতে পারবে না, কারণ ওরা ভাবে ওরা যার যার গল্পের নায়ক। আমরা ওদের বের করব। সবার সাইডই দেখাব।

আমি বললাম, তোরা প্রেম করছিস, নাকি অপারেশন?

ও হাসল। বলল, দুইটাই, আব্বা। প্রথম ছয় মাস অপারেশন। তারপর প্রেম হয়ে গেছে, ইচ্ছার বাইরে।

তোমাদেরটাও আমাদের গল্পের আগের অংশ। তোমরা ভাবছিলা তোমরা যুদ্ধটা করতেছো। তোমরা আসলে আমাদের বিয়ের কার্ডটা রেডি করছিলে, ত্রিশ বছর ধরে।

মকবুল আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল সন্তানদের এই মহা ষড়যন্ত্র উদঘাটন করে।

সাতশো মানুষ। নাচগান, খাওয়া দাওয়া। একজন সানাই বাদক কী বেদনার সুরে সানাই বাজাল। রঙিন আলো। আর সোফায় দুইটা বুড়া লোক, যারা ত্রিশ বছর একটা যুদ্ধ করেছে। শত্রু ছিলাম কি না জানি না। তবে যুদ্ধটা বাস্তব ছিল, অস্ত্র ছিল একটা না খোলা দরজা আর একটা না পৌঁছানো কাগজ।